অংশ ৭: কর পরিশোধ · চতুর্থ অধ্যায়: সাধারণ বিধানাবলি
ধারা ১৪৩ — কর্তন, সংগ্রহ, ইত্যাদির ব্যর্থতার ফলাফল
Income Tax Act, 2023 · Section 143
আইনের মূল পাঠ
১৪৩। (১) যেইক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি এই অংশের বিধানাবলির অধীন-
(ক) উৎসে কর কর্তন বা সংগ্রহ করিতে ব্যর্থ হন; বা
(খ) অপেক্ষাকৃত কম হারে বা পরিমাণে কর কর্তন বা সংগ্রহ করেন; বা
(গ) উৎসে কর কর্তন বা সংগ্রহ করিবার পর তাহা সরকারের অনুকূলে জমা প্রদান করিতে ব্যর্থ হন অথবা যেই পরিমাণ কর কর্তন বা সংগ্রহ করেন তাহার চাইতে কম পরিমাণ অর্থ সরকারের অনুকূলে জমা প্রদান করেন; বা
(ঘ) অন্য কোনো প্রকার পরিপালনে ব্যর্থ হন,
সেইক্ষেত্রে এইরূপ ব্যক্তি খেলাপি করদাতা হিসাবে গণ্য হইবেন।
(২) উপ-ধারা (১) অনুযায়ী খেলাপি করদাতা হিসাবে গণ্য ব্যক্তি, এই আইনের অধীন অন্য যে সকল পরিণতির জন্য দায়ী হইতে পারেন তাহা ক্ষুণ্ন না করিয়া নিম্নবর্ণিত অর্থ পরিশোধের জন্য দায়ী থাকিবেন, যথা:-
(ক) যেই পরিমাণ অর্থ কর্তন বা সংগ্রহ করা হয় নাই;
(খ) যেই পরিমাণ অর্থ কর্তন বা সংগ্রহ করা আবশ্যক এবং প্রকৃতভাবে যাহা কর্তন বা সংগ্রহ করা হইয়াছে এই দুইয়ের পার্থক্যের সমপরিমাণ অর্থ; বা
(গ) কর কর্তন বা সংগ্রহ করিবার পর যেই পরিমাণ অর্থ সরকারের অনুকূলে জমা প্রদান করা হয় নাই তাহার সমপরিমাণ অর্থ; এবং
(ঘ) অন্য কোনো বিধানাবলি পরিপালনের ব্যর্থতায় অনধিক ১০ (দশ) লক্ষ টাকা।
(৩) উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত পরিমাণের অর্থ পরিশোধ ছাড়াও, উপ-ধারা (১) অনুযায়ী খেলাপি করদাতা হিসাবে গণ্য ব্যক্তি উপ-ধারা (২) এর দফা (ক), (খ) এবং (গ) এ উল্লিখিত পরিমাণের উপর নিম্নবর্ণিত সারণীতে প্রদত্ত অতিরিক্ত অর্থ গণনার ভিত্তি অঙ্কের উপর প্রতিমাসে ২% (দুই শতাংশ) হারে অতিরিক্ত পরিমাণ অর্থ পরিশোধের জন্য দায়ী হইবেন, যথা:-
সারণী
ক্রমিক নং | ক্ষেত্রসমূহ | অতিরিক্ত অর্থ পরিগণনার ভিত্তি |
(১) | (২) | (৩) |
১। | এই অংশের বিধানাবলি অনুসারে কর কর্তন বা সংগ্রহের ব্যর্থতা | যেই পরিমাণ উৎসে কর কর্তন বা সংগ্রহ করা হয়নি। |
২। | কমহারে বা কম পরিমাণে কর কর্তন বা সংগ্রহ | যেই পরিমাণ উৎসে কর কম কর্তন বা সংগ্রহ করা হইয়াছে। |
৩। | কর্তন বা সংগ্রহের পর উহা সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়া বা পরিমাণে কম জমা দেওয়া | উৎসে কর কর্তনের পর যেই পরিমাণ অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয় নাই। |
(৪) উপ-ধারা (৩) এর অধীন অতিরিক্ত অর্থ পরিগণনার মেয়াদ উৎসে কর কর্তন বা সংগ্রহের নির্ধারিত তারিখ হইতে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার তারিখ পর্যন্ত হইবে:
তবে শর্ত থাকে যে, এইরূপ মেয়াদ ২৪ (চব্বিশ) মাসের অধিক হইবে না।
(৫) উপকর কমিশনার উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত ব্যক্তিকে শুনানির যুক্তিসংগত সুযোগ প্রদান করিয়া তাহার নিকট হইতে উপ-ধারা (২) এর অধীন পরিশোধযোগ্য অর্থসহ উপ-ধারা (৩) এ উল্লিখিত অতিরিক্ত পরিমাণ অর্থ আদায়ের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করিবেন।
(৬) যেইক্ষেত্রে সরকার, সরকারি প্রতিষ্ঠান, কর্তৃপক্ষ, প্রজেক্ট, প্রোগ্রাম, সংস্থা, ইউনিট বা সরকারের আর্থিক বা পরিচালনগত সংশ্লিষ্টতা রহিয়াছে এইরূপ কোনো কর্মকাণ্ডে উৎসে কর কর্তন বা সংগ্রহের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত, সেইক্ষেত্রে-
(ক) অর্থ পরিশোধের অনুমোদন বা অনুমতির জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাভাবিক ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণ; অথবা
(খ) ছাড়পত্র, রেজিস্ট্রেশন, লাইসেন্স, পারমিট প্রদান, অনুমোদন বা অনুমতি দানের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাভাবিক ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণ,
এই ধারার অধীন কর, জরিমানা ও অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের জন্য যৌথভাবে ও পৃথকভাবে দায়ী হইবেন।
(৭) যেইক্ষেত্রে সরকার, সরকারি প্রতিষ্ঠান, কর্তৃপক্ষ, প্রজেক্ট, প্রোগ্রাম, সংস্থা, ইউনিট বা সরকারের আর্থিক বা পরিচালনগত সংশ্লিষ্টতা রহিয়াছে এইরূপ কোনো কর্মকাণ্ড ব্যতীত অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান উৎসে কর কর্তন বা সংগ্রহের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত, সেইক্ষেত্রে-
(ক) ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিজে, এবং
(খ) অর্থ পরিশোধের অনুমোদন বা অনুমতি দানের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাভাবিক ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণ-
এই ধারার অধীন কর, জরিমানা ও অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের জন্য যৌথভাবে ও পৃথকভাবে দায়ী হইবেন।
(৮) যে ব্যক্তির নিকট হইতে কর সংগ্রহযোগ্য বা কর্তনযোগ্য, তিনি ইতোমধ্যে উপ-ধারা (২) ও (৩) এ উল্লিখিত সকল প্রকারের অর্থ সম্পূর্ণভাবে পরিশোধ করিয়া থাকিলে, উপ-ধারা (২) ও (৩) এ উল্লিখিত অর্থ আদায়ের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হইবে না।
সহজ ভাষায় বুঝুন
মেন্টরের নোট · Unidara Associates
উৎসে কর না কাটলে, কম কাটলে, কেটে জমা না দিলে, বা অন্য কোনো নিয়ম না মানলে, আপনি খেলাপি করদাতা। তখন সেই কর দিতে হবে, তার উপর প্রতি মাসে ২% অতিরিক্ত (সর্বোচ্চ ২৪ মাস), আর অন্য ব্যর্থতায় ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত। অনুমোদনকারী কর্মকর্তারাও ব্যক্তিগতভাবে দায়ী।
ধাপে ধাপে বুঝি
- ১চার ধরনের ব্যর্থতা: কর না কাটা; কম হারে বা কম পরিমাণে কাটা; কেটে সরকারকে জমা না দেওয়া বা কম জমা দেওয়া; আর অন্য কোনো পরিপালনে ব্যর্থতা (যেমন রিটার্ন বা সনদ না দেওয়া)।
- ২দিতে হবে: যে কর কাটা হয়নি, বা যতটা কম কাটা হয়েছে, বা কেটেও যা জমা দেওয়া হয়নি। অন্য পরিপালনে ব্যর্থতায় সর্বোচ্চ ১০ লক্ষ টাকা।
- ৩অতিরিক্ত: উপরের অঙ্কের উপর প্রতি মাসে ২%। হিসাব হবে কর কাটার নির্ধারিত তারিখ থেকে জমা দেওয়ার তারিখ পর্যন্ত, সর্বোচ্চ ২৪ মাস। অর্থাৎ সর্বোচ্চ ৪৮%।
- ৪সরকারি প্রতিষ্ঠান বা প্রকল্পে: পরিশোধ অনুমোদনকারী কর্মকর্তা, এবং লাইসেন্স, পারমিট বা ছাড়পত্র দেওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, ব্যক্তিগতভাবে ও যৌথভাবে দায়ী।
- ৫বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে: প্রতিষ্ঠান নিজে, আর পরিশোধ অনুমোদনকারী কর্মকর্তা, যৌথভাবে ও পৃথকভাবে দায়ী।
- ৬উপকর কমিশনার শুনানির সুযোগ দিয়ে আদায় করবেন। তবে যার কাছ থেকে কর কাটার কথা ছিল, তিনি যদি ইতিমধ্যে নিজেই পুরো কর ও অতিরিক্ত দিয়ে থাকেন, তাহলে আর আদায় হবে না।
মনে রাখুন
- না কাটা, কম কাটা, জমা না দেওয়া: সেই অঙ্ক + মাসে ২% (সর্বোচ্চ ২৪ মাস)।
- অন্য পরিপালনে ব্যর্থতা: সর্বোচ্চ ১০ লক্ষ টাকা।
- অনুমোদনকারী কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে দায়ী।
- শুনানি ছাড়া আদায় নয়।
উদাহরণ: ১০ মাস দেরিতে জমা
- ১একটি কোম্পানি ঠিকাদারের বিল থেকে জুলাই মাসে ১,০০,০০০ টাকা কর কেটেছে, কিন্তু সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে ১০ মাস পরে।
- ২অতিরিক্ত = ১,০০,০০০ × ২% × ১০ = ২০,০০০ টাকা।
- ৩মোট দিতে হবে ১,২০,০০০ টাকা। আর যিনি এই পরিশোধ অনুমোদন করেছেন, তিনিও ব্যক্তিগতভাবে দায়ী হতে পারেন।
প্র্যাকটিশনারের পরামর্শ
উৎসে কর কাটার পর দেরি না করে নির্ধারিত সময়ে জমা দিন। মাসে ২% মানে বছরে ২৪%, যেকোনো ঋণের চেয়ে ব্যয়বহুল। হিসাব বিভাগে মাসিক উৎসে কর রিকনসিলিয়েশন চালু রাখুন।
বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ
নীতি, প্রশাসন, আইন ও হিসাব, চার দিক থেকে
নীতিগত উদ্দেশ্য: আইনটা কেন এমন
উৎসে কর ব্যবস্থার সাফল্য নির্ভর করে কর্তনকারীর পরিপালনের উপর। তাই ব্যর্থতার পরিণতি কঠোর: মূল কর, মাসিক ২% অতিরিক্ত (বছরে ২৪%), আর অনুমোদনকারী কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ও যৌথ দায়। সরকারি প্রতিষ্ঠানেও কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত দায় রাখা হয়েছে, যেন সরকারি পরিশোধে উৎসে কর বাদ না যায়। ২৪ মাসের সীমা অতিরিক্ত অর্থকে অসীম হতে দেয় না।
কর কর্মকর্তার দৃষ্টিতে
উপকর কমিশনার শুনানির পর আদায় করবেন। যার কাছ থেকে কাটার কথা ছিল, তিনি নিজে পুরো কর ও অতিরিক্ত দিয়ে থাকলে কর্তনকারীর কাছ থেকে আর আদায় হয় না (উপ-ধারা ৮)। এই প্রমাণ উপস্থাপন করলে দায় এড়ানো যায়।
আয়কর আইনজীবীর দৃষ্টিতে
প্রতিরক্ষার পথ: পরিশোধটি আসলে উৎসে করের আওতায় ছিল না; প্রাপকের NBR এর সনদ ছিল; প্রাপক নিজে কর দিয়েছেন (উপ-ধারা ৮); বা হিসাবের মেয়াদ ২৪ মাস ছাড়িয়েছে। ব্যক্তিগত দায়ের নোটিশে কর্মকর্তাকে আলাদাভাবে শুনানির সুযোগ দিতে হবে।
হিসাবরক্ষক ও CA এর দৃষ্টিতে
মাসিক উৎসে কর রিকনসিলিয়েশন চালান: মোট পরিশোধ, প্রযোজ্য কর, কাটা কর, জমা কর। কোনো ঘাটতি ধরা পড়লে দ্রুত জমা দিন, কারণ প্রতি মাসের দেরিতে ২% বাড়ে।
কর পরিকল্পনার দৃষ্টিতে
ধারা ৫৬ এর অতিরিক্ত ৫০% কর আর ধারা ১৪৩ এর মাসিক ২% মিলিয়ে উৎসে কর না কাটার মোট খরচ অনেক বেশি হতে পারে। পরিপালনের খরচ সবসময় কম।
মোট দায়ের হিসাব: না কাটা আর দেরি
- ১একটি কোম্পানি ১০ লক্ষ টাকার সেবা বিলে ১,০০,০০০ টাকা উৎসে কর কাটেনি। ১৮ মাস পর যাচাইয়ে ধরা পড়ল।
- ২ধারা ১৪৩: মূল কর ১,০০,০০০ + অতিরিক্ত ১,০০,০০০ × ২% × ১৮ = ৩৬,০০০ টাকা।
- ৩এর সাথে ধারা ৫৬ অনুযায়ী ব্যবসার আয় পরিগণনায় কম কাটা কর আর তার ৫০% অতিরিক্ত কর প্রযোজ্য হতে পারে। দুই বিধানের প্রয়োগ পেশাদারের সাথে মিলিয়ে নিন।
সাধারণ ভুল
- কাটা কর মাসের পর মাস নিজের কাছে রেখে দেওয়া।
- অনুমোদনকারী কর্মকর্তার ব্যক্তিগত দায় সম্পর্কে না জানা।
করণীয় চেকলিস্ট
- মাসিক রিকনসিলিয়েশন।
- নির্ধারিত সময়ে জমা।
- প্রতিটি পরিশোধ অনুমোদনে উৎসে কর যাচাই।
- নোটিশ এলে শুনানিতে প্রমাণসহ অংশ নিন।
সাথে পড়ুন
এই বিশ্লেষণ Unidara Associates এর শিক্ষামূলক ব্যাখ্যা, NBR এর দাপ্তরিক মত নয়। আপনার নির্দিষ্ট বিষয়ে সিদ্ধান্তের আগে পরামর্শ নিন।
