অংশ ৪: আয়কর ধার্যকরণ · প্রথম অধ্যায়: কর ধার্যকরণের ভিত্তি
ধারা ২১ — রিটার্নে অপ্রদর্শিত বিদেশস্থ সম্পত্তির উপর জরিমানা আরোপ
Income Tax Act, 2023 · Section 21
আইনের মূল পাঠ
২১। (১) যেইক্ষেত্রে কোনো নিবাসী বাংলাদেশি ১[করদাতা বা জন্মসূত্রে বাংলাদেশী ছিলেন বা আছেন এইরূপ] করদাতার রিটার্নে প্রদর্শিত নহে, এইরূপ কোনো বিদেশস্থ সম্পত্তির সন্ধান পাওয়া যায় এবং করদাতা উক্তরূপ সম্পত্তি অর্জনের উৎস বা প্রকৃতি সম্পর্কে কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করিতে ব্যর্থ হন অথবা উপস্থাপিত ব্যাখ্যা উপকর কমিশনারের নিকট সন্তোষজনক প্রতীয়মান না হয়, সেইক্ষত্রে উপকর কমিশনার বিদেশস্থ সম্পত্তির ন্যায্য বাজার মূল্যের সমপরিমাণ অর্থ জরিমানা হিসাবে উক্ত করদাতার উপর আরোপ করিবেন এবং আদায় করিবেন।
(২) উপ-ধারা (১) এর বিধান এই আইন বা বাংলাদেশে বলবৎ অন্য কোনো আইনের অধীন উদ্ভূত কোনো দায়কে ক্ষুণ্ন করিবে না।
(৩) উপ-ধারা (১) এর অধীন জরিমানা আরোপের ক্ষেত্রে করদাতাকে যুক্তিসংগত শুনানির সুযোগ প্রদান করিতে হইবে।
(৪) উপকর কমিশনার উপ-ধারা (১) এর অধীন আরোপিত জরিমানা করদাতার কোনো পরিসম্পদ বা করদাতার পক্ষে অন্য কেহ কোনো পরিসম্পদ ধারণ করিলে তাহা বিক্রয় বা বাজেয়াপ্ত করিয়া আদায় করিতে পারিবেন।
(৫) যেইক্ষেত্রে উপকর কমিশনারের বিশ্বাস করিবার যুক্তিসংগত কারণ থাকে যে, করদাতার রিটার্নে অপ্রদর্শিত বিদেশস্থ সম্পত্তি রহিয়াছে, সেইক্ষেত্রে তিনি উক্ত সম্পত্তির বিষয়ে দেশে ও বিদেশে তদন্ত করিতে পারিবেন।
(৬) বোর্ড, রিটার্নে অপ্রদর্শিত কোনো সম্পত্তি ধারণ প্রতিরোধে বা বিদেশে পাচারকৃত কোনো সম্পত্তি উদ্ধারে-
(ক) যেইরূপ উপযুক্ত বিবেচনা করিবে সেইরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে পারিবে; বা
(খ) উপকর কমিশনারের নিম্নে নহে এইরূপ যেকোনো আয়কর কর্তৃপক্ষকে অনুসন্ধান বা তদন্ত পরিচালনার নিমিত্ত সম্মতি প্রদান, অনুমতি প্রদান বা ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে পারিবে।
সহজ ভাষায় বুঝুন
মেন্টরের নোট · Unidara Associates
নিবাসী বাংলাদেশি করদাতা, অথবা জন্মসূত্রে বাংলাদেশি করদাতার এমন কোনো বিদেশি সম্পত্তি পাওয়া গেল যা রিটার্নে দেখানো হয়নি। তিনি সম্পত্তির উৎসের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে না পারলে, সম্পত্তির ন্যায্য বাজারমূল্যের সমান টাকা জরিমানা হবে।
মনে রাখুন
- জরিমানা = বিদেশে থাকা অপ্রদর্শিত সম্পত্তির ন্যায্য বাজারমূল্যের সমপরিমাণ।
- এই জরিমানা অন্য আইনের দায় কমায় না। কর, অন্য জরিমানা বা মামলা আলাদাভাবে চলতে পারে।
- জরিমানা দেওয়ার আগে করদাতাকে যুক্তিসংগত শুনানির সুযোগ দিতে হবে।
- আদায়ের জন্য উপকর কমিশনার করদাতার সম্পদ, এমনকি অন্য কারো কাছে করদাতার পক্ষে রাখা সম্পদও বিক্রি বা বাজেয়াপ্ত করতে পারেন।
- সন্দেহের যুক্তিসংগত কারণ থাকলে উপকর কমিশনার দেশে ও বিদেশে তদন্ত করতে পারেন। পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারে NBR প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে।
উদাহরণ
- ১করিম সাহেব নিবাসী করদাতা। দুবাইতে তার একটি ফ্ল্যাট আছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা। কিন্তু রিটার্নের সম্পদ বিবরণীতে তিনি এটা দেখাননি।
- ২তদন্তে ফ্ল্যাটটি পাওয়া গেল, আর টাকার উৎস সম্পর্কে তিনি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারলেন না।
- ৩শুনানির পর উপকর কমিশনার ২ কোটি টাকা জরিমানা আরোপ করতে পারেন। এর বাইরে প্রযোজ্য কর ও অন্য আইনের দায়ও থাকবে।
প্র্যাকটিশনারের পরামর্শ
বিদেশে কোনো সম্পদ থাকলে (ফ্ল্যাট, ব্যাংক হিসাব, শেয়ার) তা রিটার্নের সম্পদ বিবরণীতে দেখান, আর কোন টাকায় কিনেছেন তার প্রমাণ (রেমিট্যান্স, বিদেশি আয়ের কাগজ) গুছিয়ে রাখুন।
সাম্প্রতিক পরিবর্তন
অর্থ (২০২৫-২০২৬ অর্থ বৎসর) আইন, ২০২৬ আওতা বাড়িয়েছে। এখন শুধু নিবাসী বাংলাদেশি নয়, “জন্মসূত্রে বাংলাদেশি ছিলেন বা আছেন” এমন করদাতাও এই ধারার আওতায়।
বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ
নীতি, প্রশাসন, আইন ও হিসাব, চার দিক থেকে
নীতিগত উদ্দেশ্য: আইনটা কেন এমন
অর্থ পাচার আর বিদেশে সম্পদ লুকানো বাংলাদেশের রাজস্ব ও অর্থনীতির জন্য বড় ক্ষতি। এই ধারা অপ্রদর্শিত বিদেশি সম্পদের উপর তার পুরো বাজারমূল্যের সমান জরিমানা বসায়, যা একটি শক্তিশালী নিরুৎসাহক। অর্থ (২০২৫-২০২৬ অর্থ বৎসর) আইন, ২০২৬ আওতা বাড়িয়ে জন্মসূত্রে বাংলাদেশি করদাতাদেরও অন্তর্ভুক্ত করেছে। নীতিগত বার্তা হলো বিদেশে থাকা সম্পদ রিটার্নে দেখাতে হবে এবং তার বৈধ উৎস ব্যাখ্যা করতে হবে।
কর কর্মকর্তার দৃষ্টিতে
আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময়, গোয়েন্দা তথ্য বা অভিযোগের ভিত্তিতে বিদেশি সম্পদের খোঁজ পাওয়া যায়। উপকর কমিশনার দেশে-বিদেশে তদন্ত করতে পারেন (উপ-ধারা ৫), আর জরিমানা আদায়ে করদাতার সম্পদ বা তার পক্ষে অন্যের কাছে রাখা সম্পদ বিক্রি বা বাজেয়াপ্ত করতে পারেন।
আয়কর আইনজীবীর দৃষ্টিতে
প্রতিরক্ষার মূল ভিত্তি হলো উৎসের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা: বিদেশি আয়, বৈধ রেমিট্যান্স, উত্তরাধিকার বা ব্যাংক ঋণের প্রমাণ। জরিমানার আগে যুক্তিসংগত শুনানি বাধ্যতামূলক (উপ-ধারা ৩)। মনে রাখুন, এই জরিমানা অন্য আইনের দায় (যেমন মানি লন্ডারিং) কমায় না।
হিসাবরক্ষক ও CA এর দৃষ্টিতে
বিদেশি সম্পদ দেখানোর সময় অর্জনের তারিখ, মূল্য, অর্থের উৎস আর বিনিময় হার নথিভুক্ত করুন। প্রবাসে উপার্জিত আয় দিয়ে কেনা হলে সেই আয়ের প্রমাণ (বিদেশি কর রিটার্ন, বেতন বিবরণী) সংরক্ষণ করুন।
কর পরিকল্পনার দৃষ্টিতে
বিদেশে সম্পদ থাকলে সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো রিটার্নে স্বচ্ছভাবে দেখানো। আগের বছরে বাদ পড়ে থাকলে সংশোধিত রিটার্ন বা আইনে দেওয়া অন্য সুযোগ (যেমন ধারা ২৪) নিয়ে পেশাদারের সাথে আলোচনা করুন, নোটিশ আসার আগেই।
সাধারণ ভুল
- বিদেশি ব্যাংক হিসাব বা শেয়ারকে “সম্পত্তি” মনে না করা।
- আত্মীয়ের নামে বিদেশে সম্পদ রেখে নিজেকে নিরাপদ ভাবা। আইনে করদাতার পক্ষে অন্যের কাছে রাখা সম্পদও আদায়ের আওতায়।
করণীয় চেকলিস্ট
- বিদেশে থাকা সব সম্পদ (ফ্ল্যাট, জমি, ব্যাংক হিসাব, শেয়ার, বিমা) তালিকা করে রিটার্নের সম্পদ বিবরণীতে দেখান।
- প্রতিটি সম্পদের অর্থের উৎসের প্রমাণ সংরক্ষণ করুন।
প্রশ্নোত্তর
আমি এখন বিদেশি নাগরিক, কিন্তু জন্মসূত্রে বাংলাদেশি। আমার কি এই ধারা প্রযোজ্য?
সংশোধনের পর ধারাটি “নিবাসী বাংলাদেশি করদাতা বা জন্মসূত্রে বাংলাদেশী ছিলেন বা আছেন এইরূপ করদাতা” এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আপনি বাংলাদেশে করদাতা হলে এর আওতায় আসতে পারেন। আপনার অবস্থা নির্দিষ্টভাবে যাচাইয়ের জন্য পেশাদার পরামর্শ নিন।
সাথে পড়ুন
এই বিশ্লেষণ Unidara Associates এর শিক্ষামূলক ব্যাখ্যা, NBR এর দাপ্তরিক মত নয়। আপনার নির্দিষ্ট বিষয়ে সিদ্ধান্তের আগে পরামর্শ নিন।
