অংশ ১৫: কর পরিহার রোধ · দ্বিতীয় অধ্যায়: ট্রান্সফার প্রাইসিং
ধারা ২৩৫ — আর্মস লেংথ প্রাইস পরিগণনা
Income Tax Act, 2023 · Section 235
আইনের মূল পাঠ
২৩৫। (১) লেনদেনের প্রকৃতি, নির্ভরযোগ্য তথ্যের প্রাপ্যতা, সম্পাদিত কার্যাদি, নিযুক্ত সম্পদ, গৃহীত ঝুঁকি কিংবা বিধি দ্বারা নির্ধারিত অন্যান্য ফ্যক্টরের ভিত্তিতে নিম্নবর্ণিত পদ্ধতি সমূহের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত পদ্ধতি (method) অনুসারে আন্তর্জাতিক লেনদেন সংক্রান্ত আর্মস লেংথ প্রাইস নির্ধারণ করিতে হইবে, যথা:-
(ক) কমপারেবল আনকন্ট্রোলড প্রাইস মেথড (comparable uncontrolled price method);
(খ) রিসেল প্রাইস মেথড (resale price method);
(গ) কস্ট প্লাস মেথড (cost plus method);
(ঘ) প্রফিট স্প্লিট মেথড (profit split method);
(ঙ) ট্রানজেকশনাল নেট মার্জিন মেথড (transactional net margin
method);
(চ) অন্য যেকোনো পদ্ধতি, যেইক্ষেত্রে প্রমাণ দেওয়া যায় যে,-
(অ) আন্তর্জাতিক লেনদেনের আর্মস লেংথ প্রাইস নির্ধারণ করিবার জন্য দফা (ক) হইতে (ঙ) এ উল্লিখিত কোনো পদ্ধতি যুক্তিসঙ্গতভাবে প্রয়োগ করা সম্ভবপর নহে; এবং
(আ) উক্ত পদ্ধতি আর্মস লেংথ প্রাইসের সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ ফলাফল প্রদান করে।
(২) যেইক্ষেত্রে উপ-ধারা (১) এর দফা (ঘ) বা (চ) এ উল্লিখিত পদ্ধতি ব্যতীত অন্য কোনো একটি পদ্ধতিকে সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত পদ্ধতি হিসাবে প্রয়োগ করা হয় এবং আর্মস লেংথ প্রাইসের ডাটাসেটে ৬ (ছয়) বা তাহার অধিক এন্ট্রি থাকে, সেইক্ষেত্রে উক্ত ডাটাসেটের ৩০ (ত্রিশ) হইতে ৭০ (সত্তর) পার্সেন্টাইল মধ্যে অবস্থিত ডাটা লইয়া একটি আর্মস লেংথ রেঞ্জ গঠন করিতে হইবে এবং নিম্নবর্ণিত শর্তানুসারে আমর্স লেংথ প্রাইস নির্ধারিত হইবে, যথা:-
(ক) যে মূল্যে প্রকৃত আন্তর্জাতিক লেনদেন সংঘটিত হইয়াছে তাহা যদি উপরি-বর্ণিত রেঞ্জের মধ্যে থাকে তবে উক্ত মূল্যই আর্মস লেংথ প্রাইস হিসাবে বিবেচিত হইবে;
(খ) যে মূল্যে প্রকৃত আন্তর্জাতিক লেনদেন সংঘটিত হইয়াছে তাহা যদি উপরোল্লিখিত রেঞ্জের মধ্যে না থাকে তবে ডাটাসেটের মধ্যমাকে আর্মস লেংথ প্রাইস ধরিতে হইবে;
(গ) যদি আর্মস লেংথ প্রাইসের ডাটাসেটে ছয়ের কম সংখ্যক এন্ট্রি থাকে, তবে ডাটাসেটের অন্তর্ভুক্ত সকল ভ্যালুর গাণিতিক গড়ই হইবে আমর্স লেংথ প্রাইস।
(৩) আর্মস লেংথ প্রাইস নির্ধারণের জন্য উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত মেথড বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে প্রযোজ্য হইবে:
তবে শর্ত থাকে যে, এই ধারার অধীন কোনো আন্তর্জাতিক লেনদেনের নির্ধারিত আর্মস লেংথ প্রাইসের ফলস্বরূপ প্রাপ্ত মোট আয় উক্ত আন্তর্জাতিক লেনদেন প্রকৃতপক্ষে যে মূল্যে সম্পন্ন হইয়াছিল সেই মূল্যই ধার্য বা পরিশোধিত বিবেচিত হইলে যে মোট আয় পাওয়া যেতো তাহা অপেক্ষা কম হইবে না।
(৪) যেইক্ষেত্রে অংশ ১০ এর অধীন কোনো কর নির্ধারণকালে উপকর কমিশনার এইরূপ অভিমত পোষণ করেন যে,-
(ক) করদাতা কর্তৃক আন্তর্জাতিক লেনদেনের জন্য ধার্যকৃত বা পরিশোধিত মূল্য উপ-ধারা (১) ও (৩) অনুসারে নির্ধারণ করা হয় নাই;
(খ) করদাতা ধারা ২৩৭ অনুসারে তথ্য, দলিলাদি বা রেকর্ড রাখিতে ব্যর্থ হইয়াছে; বা
(গ) করদাতা কর্তৃক যে তথ্য বা উপাত্তের ভিত্তিতে আর্মস লেংথ প্রাইস নির্ধারণ করা হইয়াছে তাহা নির্ভরযোগ্য বা শুদ্ধ নহে,
সেইক্ষেত্রে উপকর কমিশনার তাহার নিকট প্রাপ্য তথ্য বা দলিলাদি বা প্রমাণাদির ভিত্তিতে উপ-ধারা (১) ও (৩) এর বিধানাবলি অনুসারে উক্ত আন্তর্জাতিক লেনদেনের আর্মস লেংথ প্রাইস নির্ধারণ করিতে পারিবেন।
(৫) উপ-ধারা (৪) এর অধীন আর্মস লেংথ প্রাইস নির্ধারণের ক্ষেত্রে, উপকর কমিশনার তাহার নিকটে প্রাপ্য তথ্য বা দলিলাদি বা প্রমাণাদির ভিত্তিতে কেন আর্মস লেংথ প্রাইস নির্ধারণ করা হইবে না তৎমর্মে নোটিশ প্রদানপূর্বক নোটিশে উল্লিখিত তারিখ ও সময়ের মধ্যে করদাতাকে কারণ দর্শানোর সুযোগ প্রদান করিবেন।
(৬) যেইক্ষেত্রে এই উপ-ধারা (৪) ও ধারা ২৩৬ এর উপ-ধারা (৪) এর অধীন আর্মস লেংথ প্রাইস নির্ধারণ করা হয়, সেইক্ষেত্রে উপকর কমিশনার উক্তরূপে নির্ধারিত আর্মস লেংথ প্রাইস বিবেচনা করিয়া লিখিত আদেশ দ্বারা করদাতার মোট আয় পরিগণনা শুরু করিবেন।
সহজ ভাষায় বুঝুন
মেন্টরের নোট · Unidara Associates
আর্মস লেংথ প্রাইস বের করতে পাঁচটি স্বীকৃত পদ্ধতির (CUP, রিসেল প্রাইস, কস্ট প্লাস, প্রফিট স্প্লিট, TNMM) মধ্যে সবচেয়ে উপযুক্তটি বা প্রমাণসাপেক্ষে অন্য পদ্ধতি ব্যবহার করতে হয়। তুলনীয় ডেটা ৬টি বা বেশি হলে ৩০ থেকে ৭০ পার্সেন্টাইলের রেঞ্জ; প্রকৃত দাম রেঞ্জে থাকলে গ্রহণযোগ্য, না থাকলে মধ্যমা। ৬টির কম হলে গড়। আর্মস লেংথ সমন্বয়ে আয় কখনো প্রকৃত দামে হিসাবের চেয়ে কমবে না।
ধাপে ধাপে বুঝি
- ১উপ-ধারা (১), পদ্ধতি: লেনদেনের প্রকৃতি, নির্ভরযোগ্য তথ্যের প্রাপ্যতা, কার্যাবলি, নিযুক্ত সম্পদ, ঝুঁকি ইত্যাদি বিবেচনায় সবচেয়ে উপযুক্ত পদ্ধতি: (ক) Comparable Uncontrolled Price (CUP); (খ) Resale Price; (গ) Cost Plus; (ঘ) Profit Split; (ঙ) Transactional Net Margin (TNMM); (চ) অন্য পদ্ধতি, যদি (ক)–(ঙ) যুক্তিসংগতভাবে প্রয়োগ করা না যায় আর ফলাফল আর্মস লেংথের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
- ২উপ-ধারা (২), রেঞ্জ: প্রফিট স্প্লিট বা অন্য পদ্ধতি ছাড়া অন্য কোনো পদ্ধতি সবচেয়ে উপযুক্ত হলে, আর ডেটাসেটে ৬ বা বেশি এন্ট্রি থাকলে, ৩০ থেকে ৭০ পার্সেন্টাইলের মধ্যে রেঞ্জ। প্রকৃত দাম রেঞ্জে থাকলে সেটাই আর্মস লেংথ; না থাকলে ডেটাসেটের মধ্যমা। ৬টির কম এন্ট্রি হলে সব ভ্যালুর গাণিতিক গড়।
- ৩উপ-ধারা (৩): পদ্ধতি বিধিতে নির্ধারিত উপায়ে প্রয়োগ। শর্তাংশ: আর্মস লেংথ প্রাইসে হিসাব করা মোট আয় প্রকৃত দামে হিসাবের মোট আয়ের চেয়ে কম হবে না। অর্থাৎ এই নিয়মে আয় শুধু বাড়ে, কমে না।
- ৪উপ-ধারা (৪) ও (৫): কর নির্ধারণকালে উপকর কমিশনার যদি মনে করেন দাম নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত হয়নি, ধারা ২৩৭ এর রেকর্ড রাখা হয়নি, বা ডেটা নির্ভরযোগ্য নয়, তাহলে নিজে আর্মস লেংথ প্রাইস নির্ধারণ করতে পারেন। তবে আগে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিতে হবে।
- ৫উপ-ধারা (৬): নির্ধারিত আর্মস লেংথ প্রাইস বিবেচনা করে লিখিত আদেশে মোট আয় পরিগণনা।
- ৬সময়সীমা: আর্মস লেংথ প্রাইস পরিগণনার জন্য সংশ্লিষ্ট করবর্ষ শেষের পরের ৫ করবর্ষ (ধারা ১৯৭(১)(ঙ))।
মনে রাখুন
- পাঁচটি পদ্ধতি: CUP, Resale Price, Cost Plus, Profit Split, TNMM (+ প্রমাণসাপেক্ষে অন্য)।
- ৬+ ডেটা: ৩০–৭০ পার্সেন্টাইল রেঞ্জ; বাইরে হলে মধ্যমা।
- ৬ এর কম ডেটা: গাণিতিক গড়।
- আয় প্রকৃত দামে হিসাবের চেয়ে কমবে না।
- উপকর কমিশনার নির্ধারণের আগে কারণ দর্শানো বাধ্যতামূলক।
উদাহরণ: রেঞ্জের হিসাব
- ১একটি বাংলাদেশি কোম্পানি বিদেশি প্যারেন্টকে কন্ট্রাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিং সেবা দেয়, খরচের উপর ৫% মার্কআপে। TNMM পদ্ধতিতে ১০টি তুলনীয় স্বাধীন কোম্পানির মার্কআপ পাওয়া গেল।
- ২ধরা যাক ৩০ থেকে ৭০ পার্সেন্টাইলের রেঞ্জ ৮% থেকে ১২%, আর মধ্যমা ১০%।
- ৩প্রকৃত ৫% রেঞ্জের বাইরে, তাই আর্মস লেংথ মার্কআপ ধরা হবে মধ্যমা ১০%। খরচ ১০ কোটি টাকা হলে আয় বাড়বে ১০ কোটির (১০% − ৫%) = ৫০ লক্ষ টাকা।
- ৪প্রকৃত মার্কআপ ৯% হলে তা রেঞ্জের ভেতরে, তাই কোনো সমন্বয় হতো না।
উদাহরণ: কম তুলনীয় ডেটা
- ১মাত্র ৪টি তুলনীয় লেনদেন পাওয়া গেল, দাম ৯০, ১০০, ১০৫ ও ১১৫ টাকা। ছয়ের কম, তাই আর্মস লেংথ প্রাইস = গড় = (৯০+১০০+১০৫+১১৫)/৪ = ১০২.৫০ টাকা।
প্র্যাকটিশনারের পরামর্শ
আন্তর্জাতিক লেনদেন থাকলে প্রতি বছর একটি ট্রান্সফার প্রাইসিং স্টাডি করে রাখুন: পদ্ধতি নির্বাচনের যুক্তি, তুলনীয় ডেটা আর রেঞ্জের হিসাব। দাম রেঞ্জের ভেতরে রাখলে সমন্বয়ের ঝুঁকি কমে।
বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ
নীতি, প্রশাসন, আইন ও হিসাব, চার দিক থেকে
নীতিগত উদ্দেশ্য: আইনটা কেন এমন
আর্মস লেংথ প্রাইস নির্ধারণে স্বচ্ছ, গাণিতিক নিয়ম: স্বীকৃত পদ্ধতি, ৩০–৭০ পার্সেন্টাইল রেঞ্জ, মধ্যমা বা গড়। শর্তাংশটি একমুখী: ট্রান্সফার প্রাইসিং সমন্বয়ে আয় কমানো যায় না, যা রাজস্ব সুরক্ষার নীতি।
কর কর্মকর্তার দৃষ্টিতে
নিজে আর্মস লেংথ প্রাইস নির্ধারণের আগে উপ-ধারা (৪) এর তিন ভিত্তির কোনটি প্রযোজ্য তা লিখুন, আর উপ-ধারা (৫) এর কারণ দর্শানোর নোটিশ দিন।
আয়কর আইনজীবীর দৃষ্টিতে
বিরোধের সাধারণ বিষয়: পদ্ধতি নির্বাচন, তুলনীয় প্রতিষ্ঠানের বাছাই (কার্যাবলি ও ঝুঁকির মিল), ডেটার বছর, আর সমন্বয়। রেঞ্জের বাইরে হলে সমন্বয় হয় মধ্যমায়, রেঞ্জের প্রান্তে নয়, যা করদাতার জন্য বেশি খরচের। সময়সীমা ৫ করবর্ষ (ধারা ১৯৭(১)(ঙ))।
হিসাবরক্ষক ও CA এর দৃষ্টিতে
TP স্টাডিতে কার্যাবলি, সম্পদ ও ঝুঁকি (FAR) বিশ্লেষণ, তুলনীয় বাছাইয়ের মানদণ্ড, ডেটাবেস ও বছর, আর পার্সেন্টাইল হিসাবের ওয়ার্কিং রাখুন। ডেটা ৬টির কম হলে গড় ব্যবহারের নিয়ম মনে রাখুন।
কর পরিকল্পনার দৃষ্টিতে
আন্তঃপ্রতিষ্ঠান দাম বছরের মাঝে পর্যালোচনা করে রেঞ্জের ভেতরে রাখুন (প্রয়োজনে বছর শেষে দাম সমন্বয় চুক্তি), কারণ রেঞ্জের বাইরে গেলে সমন্বয় মধ্যমায় হয়।
জটিল উদাহরণ: সুদের হার
- ১বাংলাদেশি সাবসিডিয়ারি বিদেশি প্যারেন্ট থেকে ঋণ নিয়ে ১২% সুদ দেয়। তুলনীয় স্বাধীন ঋণের ৮টি ডেটায় ৩০–৭০ পার্সেন্টাইল রেঞ্জ ৭%–৯%, মধ্যমা ৮%।
- ২প্রকৃত ১২% রেঞ্জের বাইরে, তাই আর্মস লেংথ সুদ ৮%। বাড়তি ৪% সুদ খরচ অননুমোদিত হয়ে আয় বাড়বে। শর্তাংশ অনুযায়ী এই সমন্বয় আয় কমাতে পারত না, শুধু বাড়ায়।
সাধারণ ভুল
- TP স্টাডি না করে গ্রুপের দেওয়া দাম মেনে নেওয়া।
- তুলনীয় প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ে কার্যাবলি ও ঝুঁকির পার্থক্য উপেক্ষা।
- রেঞ্জের প্রান্তে সমন্বয় আশা করা, অথচ আইন মধ্যমা বলে।
সাথে পড়ুন
এই বিশ্লেষণ Unidara Associates এর শিক্ষামূলক ব্যাখ্যা, NBR এর দাপ্তরিক মত নয়। আপনার নির্দিষ্ট বিষয়ে সিদ্ধান্তের আগে পরামর্শ নিন।
